ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশে কোকা-কোলা বয়কট রীতিমতো আইকনে পরিণত হয়েছে। কারণ এ যুদ্ধে তেল আবিবের সবচেয়ে বড় সমর্থক যুক্তরাষ্ট্র। স্বভাবত এর প্রভাব ফিলিস্তিনিদের মাঝেও পড়েছে।
এপির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, আজকাল ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরে খাবারের সঙ্গে কোক অর্ডার করলে মাথা নাড়িয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন অনেক ওয়েটার। অসন্তুষ্টির মাত্রা বেশি হলে আরবিতে ফিসফিস করে বলতেও পারেন, ‘লজ্জা, লজ্জা’। এরপর ক্রেতাকে স্থানীয় পানীয় চ্যাট কোলা প্রস্তাব করতে পারেন তিনি।
লাল ক্যানের ওপর সাদা বাঁকানো হরফে লেখা চ্যাট কোলা, যা দেখতে কোকা-কোলার মতোই। গত বছরে পশ্চিম তীরে পানীয়টি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেখানকার বাসিন্দারা একে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে দেখেন। রামাল্লার ক্যাফে-চেইন ক্রসেন্ট হাউজের ২১ বছর বয়সী কর্মী মাদ আসাদ বলেন, ‘কেউ কোক পান করে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে চান না। সবাই এখন চ্যাট পান করছেন। এটি একটি বার্তা পাঠাচ্ছে।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলে ব্যাপক হামলা চালায়, এরপর সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে গাজাকে এক প্রকার ধুলোয় মিশিয়ে দেয় তেল আবিব। তখন ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন বয়কট আন্দোলন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন গতি পায়। এতে ম্যাকডোনাল্ডস, কেএফসি ও স্টারবাকসের মতো মার্কিন ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি কমে যায়।
পশ্চিম তীরে বয়কটের ফলে রামাল্লার দুটি কেএফসির শাখা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বয়কটের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা গেছে চ্যাট কোলার উত্থানে। এখন দোকানিরা কোকা-কোলার ক্যান ফ্রিজের নিচের তাকে সরিয়ে দিচ্ছেন বা একেবারেই তুলে ফেলছেন।
চ্যাট কোলার জেনারেল ম্যানেজার ফাহেদ আরার বলেন, ‘আমি গর্বিত যে এমন একটি পণ্য তৈরি করেছি, যা একটি বিশ্বখ্যাত কোম্পানির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।’
যুদ্ধ চলাকালে ‘স্থানীয় পণ্য কিনুন’ আন্দোলন ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বেশ গতি পায়। ফলে ২০২৩ সালের তুলনায় পশ্চিম তীরে চ্যাট কোলার বিক্রি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। সালফিটের সুপারমার্কেট মালিক আবদুল কাদের আজিজ হাসান বলেন, ‘আগে চ্যাট কোলা ছিল বিশেষ একটি পণ্য, কিন্তু এখন এটি বাজার দখল করে নিয়েছে।’
কোকা-কোলার পশ্চিম তীরের ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালনা করে ন্যাশনাল বেভারেজ কোম্পানি। সংস্থাটির জেনারেল ম্যানেজার ইমাদ হিন্দি জানালেন, তাদের সব কর্মীই ফিলিস্তিনি এবং এ বয়কট তাদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অবশ্য বয়কটের ব্যবসায়িক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত বলেননি তিনি। এটুকুই বললেন, ‘এখন বাজার মন্দা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তাজনিত নিয়ন্ত্রণের কারণে পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
এ বয়কটের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত বলে জানালেন রামাল্লা চেম্বার অব কমার্সের প্রধান সালাহ হোসেইন। তিনি বলেন, ‘এ মাত্রার বয়কট এর আগে আমরা কখনো দেখিনি।’
সালাহ হোসেইন উল্লেখ করেন, বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কোকের অর্ডার বাতিল করেছে। ৭ অক্টোবরের পর সবকিছু বদলে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার পর আরো পরিবর্তন আসবে। কারণ তার গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের গণ-উচ্ছেদের আহ্বান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনবিরোধী মনোভাব আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
এদিকে স্থানীয় জনপ্রিয়তাকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার দিকে নজর চ্যাট কোলার। এ সম্প্রসারণ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ‘প্যালেস্টিনিয়ান টেস্ট’ লোগো এবং ক্যানের গায়ে জাতীয় পতাকার রঙে নতুনভাবে ব্র্যান্ডিং হচ্ছে। চাহিদা সামলাতে চ্যাট কোলা জর্ডানে দ্বিতীয় কারখানা খুলছে এবং ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি ও গ্রিন অ্যাপলের মতো নতুন ফ্লেভার চালু করেছে।
ফ্রান্সের রসায়নবিদদের সহায়তায় চ্যাট কোলা এমন একটি স্বাদ তৈরি করেছে, যা প্রায় কোকা-কোলার মতোই। ২০২০ সালে কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে পশ্চিম তীরের আদালতে চ্যাট কোলার বিরুদ্ধে মামলা করে ন্যাশনাল বেভারেজ কোম্পানি। কিন্তু আদালত রায় দেয়, চ্যাট কোলার ডিজাইনে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
চ্যাট কোলা শুধু পশ্চিম তীরেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলের আরব শহরগুলোয় আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালের বিক্রি বেড়েছে ২৫ শতাংশ। তবে চ্যাট কোলা ইসরায়েল থেকে কিছুই কিনতে চায় না। ফ্রান্স, ইতালি ও কুয়েত থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে কোম্পানি, যা কিনা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের কারণে অনেক সময় সমস্যায় পড়ে।